বৃহঃস্পতিবার, ০৫ আগস্ট ২০২১

যমজ শিশু জন্মের কারণ ও ঝুঁকি

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগে কিছুদিন আগে একজন নারীর একসঙ্গে চারজন বাচ্চা প্রসব করার পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হৈ চৈ শুরু হয়েছে। বর্তমানে বাচ্চাগুলোর মা সুস্থ থাকলেও বাচ্চাদেরকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। গত ৩ জুলাই সন্ধ্যার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের ২১২ নম্বর ওয়ার্ডে জন্ম নেয় ওই চার শিশু।

তাদের মা বর্তমানে সুস্থ থাকলেও গুরুতর অবস্থায় ওই চার শিশুকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সাত মাস গর্ভে থাকার পর শিশুগুলো ভূমিষ্ঠ হওয়া তাদের অবস্থা কিছুটা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক।

তিনি জানান, নয় মাস বয়স পর্যন্ত তাদেরকে বিশেষ ব্যবস্থায় রাখতে হবে। কারণ যেকোনো সময় তাদের সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে।

যমজ শিশু সম্পর্কে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ডা. কিশোয়ার সুলতানা বলেন, যমজ শিশু গর্ভে ধারণ করার বিষয়টিকে চিকিৎসা শাস্ত্রে মাল্টিপল প্রেগনেন্সি বা একের অধিক শিশুকে গর্ভে ধারণ করা বলা হয়।

তিনি বলেন, ঢাকা মেডিকেলে ওই নারী চার সন্তানের জন্ম দিলেও সাধারণত এ ধরণের গর্ভাবস্থায় দুটি শিশু এক সাথে জন্মগ্রহণ করে। একে যমজ বা টুইন বলা হয়। তবে তিন থেকে চারটি শিশুও একসাথে জন্ম নিতে পারে।

চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাজ্যের হিউম্যান রিপ্রোডাকশন নামে একটি সায়েন্টিফিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে ১৬ লাখ যমজ শিশু জন্ম নেয়। যা গড়ে ৪২টি শিশুর মধ্যে একজন যমজ। ১৬৫টি দেশের ২০১০ থেকে ২০১৫ সালে যমজ সন্তান প্রসবের তথ্য সংগ্রহ করে তা ১৯৮০-১৯৮৫ সালের তথ্যের সাথে তুলনা করা হয় ওই গবেষণায়।

১৯৮০ সালের পর থেকে পরবর্তী ৩০ বছরে যমজ শিশু জন্মদানের ঘটনা তিন গুণ বেড়েছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি এক হাজারের মধ্যে ১২টি যমজ শিশু জন্ম নিচ্ছে। এর আগে এই সংখ্যা ছিল ৯টি। তবে হার বৃদ্ধির এই ঘটনা ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকা অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে। এশিয়া এবং আফ্রিকা অঞ্চলে এর আগে থেকেই যমজ শিশুর জন্মদানের ঘটনা বেশি ছিল। বিশ্বে যত যমজ শিশু জন্ম নেয় তার ৮০ ভাগই আফ্রিকা এবং এশিয়া অঞ্চলে।

যমজ শিশুর জন্ম নেওয়া কারণ

হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালের অধ্যাপক কিশোয়ার সুলতানা বলেন, সাধারণত একজন নারী তখনই গর্ভধারণ করেন যখন তার ওভাম বা ডিম্বাণু কোন একটি শুক্রাণুর সাথে মিলিত হয়। একজন নারীর শরীর থেকে সাধারণত এক সময়ে একটি ডিম্বাণুই বের হয়। তবে পুরুষদের স্পার্ম বা শুক্রাণু অগণিত থাকে। যদি কোনো স্পার্ম বা শুক্রাণু একটি ডিম্বাণুকে গ্রহণ করতে পারে তাহলে গর্ভধারণ হয়।

কিন্তু একের অধিক ডিম্বাণু বের হলে যদি তাদের অধিক শুক্রাণু গ্রহণ করে তাহলে একাধিক শিশু এক সাথে বেড়ে উঠে এবং এর কারণেই যমজ শিশু জন্মগ্রহণ করে। তবে অনেক সময় একটি ডিম্বাণু থেকেও যমজ শিশুর জন্ম হতে পারে।

অধ্যাপক সুলতানা বলেন, এক্ষেত্রে একটি ডিম্বাণু একটি শুক্রাণুর সাথে মিলিত হওয়ার পর যখন দেহ গঠন শুরু হয় তখন কোষ বিভাজন প্রক্রিয়ায় একটা কোষ ভেঙ্গে দুটো হয়। দুটো ভেঙ্গে চারটা হয়। এই সময়ে যদি এই কোষগুলো আলাদা হয়ে পড়ে এবং প্রতিটি কোষ আলাদাভাবে বেড়ে ওঠে তাহলে একই সাথে একাধিক শিশুর জন্ম হতে পারে।

যমজ শিশু দুই ধরণের হয়ে থাকে

১. মনোজাইগোটিক টুইন: একটি ডিম্বাণু ভেঙ্গে যখন দুটি বা ততোধিক শিশুর জন্ম হয় তাকে মনোজাইগোটিক টুইন বলা হয়। এ ধরণের শিশুদের আইডেনটিক্যাল টুইনও বলা হয়। সাধারণত এরা দেখতে একই রকম হয় এবং একই লিঙ্গের হয়ে থাকে। অর্থাৎ হয় দুটো ছেলে বা দুটো মেয়ে হবে। এদের গায়ের রঙ, চুল ও চোখের রঙ, রক্তের গ্রুপ সবই এক হয়ে থাকে। তবে এ ধরণের যমজ শিশুর সংখ্যা খুব একটা বেশি দেখা যায় না।

২. ডাইজাইগোটিক টুইন: এক্ষেত্রে দুটি ডিম্বাণু আলাদা দুটি শুক্রাণুর সাথে মিলিত হয় এবং আলাদা আলাদাভাবেই বেড়ে ওঠে তাকে ফ্র্যাটার্নাল বা ডাইজাইগোটিক টুইন বলা হয়। এক্ষেত্রে শিশুর লিঙ্গ এক হতেও পারে আবার নাও পারে। একটি ছেলে একটি মেয়ে হতে পারে। এরা দেখতে এক রকম হয় না। গায়ের রঙ বা রক্তের গ্রুপও আলাদা হতে পারে।

কোনো নারী যমজ শিশু নিয়ে গর্ভধারণ করলে গর্ভাবস্থায় এবং সন্তান জন্ম দেয়ার সময় তার ঝুঁকি সাধারণ গর্ভাবস্থার তুলনায় অনেক বেশি থাকে। এ ধরণের গর্ভাবস্থার গর্ভপাতের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে বলে জানান অধ্যাপক সুলতানা। বমি, মাথা ঘোরা, উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস দেখা দিতে পারে।

অধ্যাপক সুলতানা আরো বলেন, গর্ভধারণ করলে বাচ্চার সাথে সাথে গর্ভফুল বা প্লাসেন্টাও বাড়তে থাকে। তবে দুটি বাচ্চা থাকার কারণে প্লাসেন্টা একটা সময় পরে আর বড় হতে পারে না। তখন রক্তপাত শুরু হয়। অর্থাৎ, প্রসবের আগেই রক্তপাত শুরু হয়। এছাড়া প্রসবের পরেও মায়ের অতিরিক্ত রক্তপাত হতে পারে।

তিনি বলেন, যদি কোনো মা জানতে পারেন যে, তার গর্ভে যমজ শিশু রয়েছে তাহলে তাকে অবশ্যই বিশ্রামে থাকতে হবে। এছাড়া নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে যাতে এ ধরণের কোনো সমস্যা দেখা দিলে আগে থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

যমজ শিশু জীবিত থাকার সম্ভাবনা

হিউম্যান রিপ্রোডাকশনে প্রকাশিত ওই গবেষণা থেকে জানা গেছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে যমজ শিশুদের জীবিত থাকার হার খুবই কম। সাব-সাহারা আফ্রিকা অঞ্চলে অনেক যমজ শিশুই জন্মের প্রথম বছরেই তাদের সহোদরকে হারায়। প্রতিবছর এই সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। গবেষকরা বলছেন, ভবিষ্যতের যমজ শিশুর জন্মহারে বড় ভূমিকা রাখবে ভারত এবং চীন।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »

Translate »