শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০

সরকারের প্রথম বছরের সাফল্য ছিল দৃশ্যমান

:: হাজী মোঃ আমিনুল ইসলাম ::

আলোচিত সাফল্য আর সঙ্গে সমালোচনার ঢেউ- এতেই পার হলো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের টানা তৃতীয়বারের সরকারের প্রথম বছর । এই এক বছরে সরকারের বড় সফলতা দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান শুরু আর গুজব মোকাবিলা। তবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে, বিশেষ করে পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হয়েছে সরকারকে। বাজার দর নিয়ন্ত্রণে, বিশেষ করে পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয় এই সরকারকে। তবে প্রবৃদ্ধি ও অন্যান্য খাতের দিকে তাকালে অনিয়ন্ত্রিত বাজার প্রেক্ষাপট ইগনোর করা যেতেই পারে।

২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি চলতি মেয়াদের সরকার গঠিত হয়েছিল। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনে ২৫৭টি আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। জোটগতভাবে তাদের আসন সংখ্যা দাঁড়ায় ২৮৮টি। অন্যদিকে বিএনপিকে নিয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ভরাডুবি হয় নির্বাচনে। এ হিসেবে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ চালানোয় টানা ১১ বছর পার করছে আওয়ামী লীগ সরকার। এ মেয়াদের শুরু থেকে এক বছরের শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলের রাজনৈতিক কোনো চাপ সরকারকে স্পর্শ করতে পারেনি। এটা একদিকে বিরোধীদের ব্যর্থতা, অন্যদিকে সরকারের বড় সফলতা। এই এক বছর রাজনৈতিক চাপমুক্ত হয়ে দেশ পরিচালনায় আওয়ামী লীগ পুরো সফল। তবে সারাবছরই সামাজিক ক্ষেত্র থেকে সৃষ্ট বিভিন্ন সংকট মোকাবিলা করতে হিমশিম খেতে হয়েছে সরকারকে। মোকাবিলা করতে হয়েছে কৃত্রিম সংকট গুজবও। তবে বছর জুড়ে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং তাদের জীবনমানের উন্নয়নসহ সকলের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করার দৃঢ় প্রত্যয় আমরা দেখেছি সব সময়।

গত জুলাইয়ে পদ্মাসেতুতে শিশুর কাটা মাথা দেওয়ার গুজব ছড়িয়ে পড়লে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা হয়। শিশু ধরার এই গুজব থেকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির বলি হন বেশ কয়েকজন। একপর্যায়ে সরকারের কঠোর পদক্ষেপে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এটা এই সরকারের সমাজিক অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে বড় সফলতা। এছাড়া বছরজুড়েই সামাজিক ক্ষেত্রে আরও সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারকে। এর মধ্যে সন্ত্রাস, বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে বর্বোরচিত হত্যাকা-ের ঘটনা রয়েছে, যা নিয়ে সরকারকে সমালোচনার মুখোমুখি হওয়ার পাশাপাশি পরিস্থিতি মোকাবেলায় হিমশিম খেতে হয়েছে। কারণ এর সঙ্গে জড়িত ছিল ছাত্রলীগের মতো ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের বিপথগামী কিছু ছাত্রনেতা। যদিও ছাত্রলীগ থেকে তাদেরকে কঠোর হস্তে দমনের তাগিদে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয় এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাতৃত্বের স্থান থেকে বিষয়টিকে আমলে নিয়ে একজন মায়ের বেদনার সঙ্গী হয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের নির্দেশ দেন। এদিক থেকে সফল হয় সরকার। মাস না পেরুতেই হত্যার সঙ্গে জড়িতরা ধরা পড়ে। এদিকে এবছর সরকারের আরেকটি সাফল্য হলো ফেনীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার রায়।

সরকারের এই সময়কালে বগুনার রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা সমালোচনার শীর্ষে ছিল। আলোচিত এসব হত্যাকা-ের সঙ্গে সরকারি দলের লোক জড়িত না থাকলেও প্রশাসনিক অদক্ষতার ধুয়ো তুলে কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের নেতারা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। তবে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।

গেল বছর সরকারের জন্য সবচেয়ে আলোচিত ও সাহসী পদক্ষেপ নেয় গত ১৮ সেপ্টেম্বর। এই দিন থেকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের গ্রেফতার অভিযান শুরু হয়। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে বেরিয়ে আসে রাজধানীর ক্লাবগুলোতে ক্যাসিনোসহ দুর্নীতি, অনিয়ম ও এর সঙ্গে জড়িতদের নানা তথ্য। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েক দফা অভিযানে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠন যুবলীগের কয়েক নেতা গ্রেফতার হন। এর মধ্যে বহুল আলোচিত ছিল গত ৬ অক্টোবর যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট গ্রেফতারের ঘটনা। এর আগে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য বেরিয়ে আসলে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া ছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের আরেকটি আলোচিত ঘটনা। আর বছর কাটিয়ে ওঠার একেবারে প্রান্তিক সময়ে জাতীয়ভাবে সমালোচনার মুখে ফেলে রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ঢুকে পড়া। মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী রাজাকারের তালিকা প্রকাশ ছিল সরকারের প্রত্যাশিত বিষয়। কিন্তু সেই তালিকায় বেশকিছু মুক্তিযোদ্ধার নাম চলে আসায় সমালোচনার মুখে পড়তে হয় তাদের, যা শেষপর্যন্ত গড়ায় তালিকা স্থগিত পর্যন্ত। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল চোখে পড়ার মতো। অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের কোনো অর্থমন্ত্রী বিশ্বসেরা অর্থমন্ত্রীর খেতাব পেলেন। আর তিনি হলেন আ হ ম মোস্তফা কামাল। গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮.১৫ শতাংশে উন্নীত হয়। আর মূল্যস্ফীতি পৌঁছে ৬ শতাংশের নিচে।

মিয়ানমারের দিক থেকে নানা উসকানি সত্ত্বেও সরকার সে ফাঁদে পা না দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের পথকে প্রসারিত রাখে।এডিস-মশাবাহিত ডেঙ্গুজ্বর গত বছর সারাদেশে আতঙ্ক ছড়ালেও নিয়ন্ত্রণে আনতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যদিও বেশ কিছু মূল্যবান প্রাণহানি ঘটেছে এই রোগে। এখন পর্যন্ত সরকার এডিস-মশার বিস্তার রোধে সর্বাত্মক ব্যবস্থা সঙ্গে নিয়েই কাজ করছে। ব্যর্থতার কারণেই বিদায় নিতে হচ্ছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে সাইদ খোকনকে।

সব দিক বিচারে সরকার তার প্রথম বছরে সাধ্যমত সততা, নিষ্ঠা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে কাজ করেছে এবং বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়েছে। সিন্ডিকেটের কারণে পেঁয়াজকা-, সুক্ষ্ম ষড়যন্ত্রে গুজবোবিষন্ধি মানুষকে সাময়িক সংক্ষুব্ধ করলেও তারাই পরে বুঝতে পেরে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং সরকারকে সহায়তা করেন। টানা তৃতীয়বার সরকার গঠনের প্রথম বর্ষপূর্তিতে একথা আমরা নিঃসন্দেহে বলতেই পারি জনগণকে সর্বোচ্চ সেবা দিতে সরকারের চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল না। অতীতের ছোটখাটো ভুল-ভ্রান্তিকেও অভিজ্ঞতার খাতায় তুলে নতুন সব চ্যালেঞ্জকে অর্জন করেছে। আগামীতেও আমরা তেমনটাই দেখবো।

শেয়ার করুন »

মন্তব্যসমূহ »

মন্তব্য করুন »

Translate »