শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০

বাবার বিশালতা টের পাই সময় ফুরিয়ে, তার জন্যই আজকের আমি!

:: হাজী মোঃ আমিনুল ইসলাম ::

বাবা শব্দটির বিশালতা হয়তো আমরা টের পাই সময় ফুরিয়ে। শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে অথবা দায়িত্ববোঝাই জীবনে পৌঁছে। অনেকে তারও অনেক পরে বাবাকে হারিয়ে। ততক্ষণে আফসোস আর স্মৃতিমন্থন করা ছাড়া কিছুই করার থাকে না। এই যে দূরত্ব বা মধুর সম্পর্কটিতে ধূসর রঙয়ের আগমন তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বয়ে আনে ‘জেনারেশন গ্যাপ’ বা প্রজন্মদূরত্ব নামক বিশেষণ। আমার তৃপ্তি এখানেই। আমার বাবা এই প্রজন্মদূরত্বকে পরাজিত করতে পেরেছেন। আর দশজন বাবার মতোই সাধারণ ছিল বাবা আমার। তবু আলাদা। অমীমাংসিত মত কখনো চাপিয়ে দেননি। যুক্তি দিয়ে বুঝিয়েছিলেন। ভালো-মন্দটুকু বুঝিয়েছিলেন নিজের মতো করে।

বাবাকে নিয়ে যদি লেখা শুরু করি, তাহলে কোথা থেকে যে শুরু করে কোথায় গিয়ে শেষ করবো তা বুঝে ওঠাই মুশকিল। পৃথিবীতে মানুষের শ্রেষ্ঠ আপনজনদের মধ্যে অন্যতম ব্যক্তি হলেন বাবা। তাকে কোনো একটি দিনে স্মরণ, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানানো যথেষ্ট নয়। বরং প্রতিটি দিনই যেন আমাদের বাবা দিবস।

যেখানে প্রতিমুুহূর্ত সমসাময়িক লেখকদের কাছে শুনি তাদের প্রতিবন্ধকতার কথা তখনই ভক্তির অঞ্জলি ঢেলে দেই আমার বাবা-মায়ের চরনে। তারা সেই শিশুকাল থেকেই কত সুন্দর করে দিয়ে রেখেছিলেন যৌক্তিক স্বাধীনতা। বাবার কথা ছিল, ‘যা-ই করো; পড়াশুনাটা ঠিকমতো করো। আর মানুষ মন্দ বলবে এমন কিছু করো না। তোমার বিবেক আছে বলে আমি বিশ্বাস করি।’ বাবার ওই বিশ্বাস যত্নে রেখেছিলাম। রাখছি সাধ্যানুযায়ী।

পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ মেলে প্রশস্ত বৃক্ষের মতো ছায়াদানকারী বাবার বুকে। শত আবদার আর নির্মল শান্তির এ গন্তব্যটি কারোরই অজানা নয়। দায়িত্বশীল হয়ে বেড়ে উঠতে বাবাকে দেখেই শিখি আমি। বাবাকে আমি অকৃত্রিম আন্তরিক ভালোবাসা জানাতে উপহার দিতে পারিনি। যদিও বাবা উপহার পেতে নয় দিতেই ভালোবাসতেন।

সব বাবাই শাসনে কঠোর, ভালোবাসায় কোমল, স্নেহে উদার, ত্যাগে অগ্রগামী। সন্তানের মাথার ওপর যার স্নেহচ্ছায়া বটবৃক্ষের মতো, সেই বাবার প্রতি বাবা দিবসে বিশ্বব্যাপী ঘটা করে জানানো হবে বিনম্র শ্রদ্ধা-ভালোবাসা। সন্তান যতই বড় হোক না কেন বাবার কাছে সে সব সময়ই ছোট। সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে অসীম সংগ্রাম করে স্নেহপ্রবণ বাবা, শত কষ্টের মধ্যেও সন্তানের জন্য সাধ্যমতো নিজেকে বিলিয়ে দিয়েই যার আনন্দ তিনিই তো আমাদের বাবা।

আমরা সবাই কিন্তু দাঁত থাকতে দাঁতের মূল্যায়ন করি না, ঠিক তেমনি বাবা জীবিত থাকতে বুঝতে পারি না যে কি ছায়ার নিচে নিজেকে রাখছি। বটগাছের ছায়া, রোদ-বৃষ্টিতে আশ্রয়ের স্থান। বিপদ-আপদে, রোগ-শোকে, দুশ্চিন্তা-কান্নায় যার কাছে নির্দ্বিধায় যাওয়া যায়। যে স্বার্থহীনভাবে বুকে আগলে ধরে তার যতটুকু জ্ঞান, প্রজ্ঞা আছে তা দিয়ে রক্ষাকবচ হিসেবে, ঢাল হয়ে রক্ষা করে, সে হলো বাবা।

আজ বাবা দিবসে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সন্তানরা নতুন করে বাবাকে ভালোবাসা জানাতে ব্যস্ত। ছোটবেলার বাবার সঙ্গে অনেক স্মৃতি আর ছবিতে ভরে উঠেছে সবার ওয়াল। এমনই এক সন্তান সাংবাদিক বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন লিখেছেন- “বাবা, শৈশবে তোমার গালে কবে আমি চুমু খেয়েছিলাম – মনে নেই। আজ মাঝে মাঝে তোমাকে প্রণাম করলে তুমি যখন আমার কপালে আশীর্বাদ-চুমু দাও তখন লজ্জায় আমি তোমাকে চুমু দিতে পারি না! শৈশবে তখন তুমি যুবক ছিলে, আর আমি শিশু। আজ আমি যুবক আর তুমি বুড়ো হতে হতে অনেকটাই শিশু হয়ে গেছো। অনেক কথাই আজ ভুলে যাও। মাঝে মাঝে তোমার ওপর প্রচন্ড রাগ ওঠে; তোমাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতিবাদ করে তোমার মুখের ওপর অনেক কথাই বলে ফেলি।”

এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে বর্তমানে আমি নিজেও বাবা। বড় ছেলে আরিফুল ইসলাম সাকিব পড়ে দশম শ্রেণিতে, মেয়ে আমার ফারজানা ইসলাম তায়িবা পড়ে সপ্তম শ্রেণিতে। তারাও একদিন বাবা-মা হবে। দোয়া করি আমিও যেমন আমার বাবার আদর্শে বড় হয়েছি, তারাও জানি আমার আদর্শে তার মায়ের স্নেহে বড় হোক। আমার বংশের সামনের জেনারেশন এভাবেই এগিয়ে যাক।

শুধু দিবসেই নয়, প্রতিটি দিন ও ক্ষণ হোক বাবাদের জন্য। বিশ্বের সকল বাবাদের জন্য রইল শুভকামনা।

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক বাংলাদেশের কণ্ঠ

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »

Translate »