বৃহঃস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০

অফডক নয়, খালাসে বন্দরই চায় আমদানিকারকেরা

করোনার মহাসংকটে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে অফডকগুলো। কারণ আগে যেখানে নির্ধারিত ৩৮ ধরনের পণ্য ১৮টি অফডক থেকে খালাস হওয়ায় পরেও কন্টেইনার রাখার জায়গা খালি পরে থাকতো সেই জায়গায় তারা অন্য পণ্যের কন্টেইনার রেখে খালাস করতে পারছে। আর যেহেতু অতিরিক্তি কন্টেইনার অফডকে যাওয়ায় তাদের কোন ছাড় দিতে হয়নি তাই তারা অতিরিক্ত কন্টেইনারের পণ্য খালাস করে অধিক মুনাফা করছে। এমনটাই মনে করছেন আমনাদিকারকেরা।

বৈশ্বিক করোনাভাইরাসের প্রভাব বাংলাদেশে প্রকট হওয়ার আগ মূহূর্তে সরকার দেশব্যাপী সাধারণ ছুটির ঘোষণা দিয়েছিল। সেই ছুটির ঘোষণা চট্টগ্রাম বন্দরের উপর প্রভাব ফেলে। কন্টেইনার ডেলিভারি একেবারে কমে যাওয়ায় অচল অবস্থার সৃষ্টি হয় চট্টগ্রাম বন্দরে। সমাধান কল্পে বেছে নেওয়া হয় বেসরকারি অফডকগুলোর খালি জায়গাকে। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নির্ধারিত ৩৮ ধরনের পণ্য ছাড়াও সব ধরনের পণ্য বেসরকারি ১৮টি অফডক থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত খালাসের নির্দেশনা দেয়। এতে বেশি পরিমাণ কন্টেইনার পায় অফডকগুলো। দীর্ঘদিন ধরে অফডকের বর্ধিত চার্জ নিয়ে নানা আলোচনার পরেও শেষ পর্যন্ত বর্ধিত চার্জের কোন সুরাহা হয়নি। তাই আমদানিকারকরা বিপুল অর্থ খরচ করে কন্টেইনারের পণ্য ডেলিভারি নিতে বাধ্য হচ্ছে।

পোশাক শিল্পের আমদানিকৃত কন্টেইনারের পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দর ও প্রাইভেট অফডকগুলোর চার্জের পার্থক্যের ব্যাপারে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরে একটি ২০ ফুট কন্টেইনারের আমদানি পণ্য খালাসে লিফট অন/অফ চার্জ ১ হাজার টাকা, রিভার ডিউজ ৪০৮ টাকা, লেবার চার্জ ২ হাজার ৪১৩ টাকা এবং এপ্রেইজিং লেবার চার্জ ২৪০ টাকা মিলিয়ে সর্বমোট খরচ হয় ৪ হাজার ৬১ টাকা। অন্যদিকে প্রাইভেট আইসিডিগুলোতে ২০ ফুট কন্টেইনারের আমদানি পণ্য খালাসে প্যাকেজ ডেলিভারি চার্জ ৭ হাজার ৯৩০ টাকার সাথে যুক্ত হয় লিফট অন/অফ চার্জ ১ হাজার টাকা, রিভার ডিউজ ৪০৮ টাকা এবং এক্সট্রা মুভমেন্ট চার্জ প্রায় ৫২ ডলারসহ সর্বমোট ১৩ হাজার ৭৫৫টাকা।

একইভাবে ৪০ ফুট কন্টেইনারের ক্ষেত্রে বন্দরে সর্বমোট খরচ হয় ৫ হাজার ৬৯৯টাকা। অন্যদিকে প্রাইভেট আইসিডিগুলোতে ৪০ ফুট কন্টেইনারের আমদানি পণ্য খালাসে সর্বমোট খরচ হয় ১৮ হাজার ৯২ টাকা। অর্থাৎ বন্দরের চার্জের দ্বিগুণের বেশি টাকা খরচ করে আইসিডিগুলো থেকে আমদানিকারকদের পণ্য খালাস করতে হচ্ছে।

এবিষয়ে তৈরি পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় সংগঠন বিজিএমইএ’র প্রথম সহ-সভাপতি এম এ সালাম বলেন, সরকার দেশের সাপ্লাই চেইন রক্ষার্থে এবং বন্দর সচল রাখতে অফডকে সব ধরনের পণ্য খালাসের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে অচল হয়ে যাওয়া বন্দর আবার সচল হয়। তবে বর্তমানে বন্দরের আর জট নেই। এছাড়া গত দুই মাসের মন্দাবস্থার কারণে আমদানিও কমে গেছে। সুতরাং বন্দরের এখন আর কন্টেইনার জট বাধার কোন কারণও নেই। তাই আর যেন বর্ধিত চার্জ দিয়ে গার্মেন্টস’র কোন পণ্য অফডক থেকে খালাস করতে না হয় সেটি বিবেচনা জরুরি।
ব্যবসায়ী সংগঠন চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, করোনায় এমনিতে ব্যবসায়ীদের অবস্থা খারাপ। গত দুই মাস তাদের কোন ব্যবসা হয়নি। এই অবস্থায় তাদের বন্দরের চেয়ে বেশি চার্জে অফডক থেকে পণ্য খালাস করতে হলে পথে বসা ছাড়া উপায় থাকবে না। যেসব আমদানিকারকরা আগে বন্দর থেকে পণ্য খালাস করতো তাদের এখন অফডক থেকে পণ্য খালাস করতে হচ্ছে। এখন যেহেতু বন্দরের কন্টেইনার জট কমে পরিস্থিতি স্বভাবিক হয়েছে তাই এখনই উচিত হবে ব্যবসায়ীদের রক্ষার্থে তাদের পণ্য আবার বন্দর থেকে খালাস করার ব্যবস্থা করার।

বিকল্প না থাকায় প্রাইভেট আইসিডিগুলো একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ পাচ্ছে মন্তব্য করে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোওয়ার্ডাস এসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি আমিরুল ইসলাম চৌধুরী (মিজান) বলেন, পৃথিবীর কোন দেশে বন্দর থেকে পণ্য খালাসের নিয়ম চালু নেই। বন্দরের কাজ কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং করা, কন্টেইনার স্টোর করা নয়। পৃথিবীর সব দেশে জাহাজ থেকে কন্টেইনার নেমে বড় বড় ওয়্যার হাউসে চলে যায়। সেখান থেকে পণ্য খালাস হয়। অথচ আমাদের দেশে জাহাজ থেকে কন্টেইনার নামানোর পর বন্দরেই সংরক্ষণ করা হয়। আর যখনই বন্দরে কন্টেইনার জট অবস্থা সৃষ্টি হয় তখন বিকল্প না থাকায় অফডকগুলোকে বেছে নিতে হয়। অথচ যদি বাংলাদেশে বড় বড় কয়েকটি ওয়্যার হাউস থাকতো তাহলে বন্দরে কন্টেইনার জট বাধার কোন কারণ ছিল না। আর দিনকে দিন জাহাজকে অপেক্ষা করে বসে থাকতে হতো না।
আমদানিকারকদের পণ্য খালাসকারী সংস্থার সংগঠন সিএন্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশনের প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মাহমুদ ইমাম বিলু বলেন, কোন আমদানিকারকই চায় না অফডক থেকে পণ্য ডেলিভারি নিতে। কারণ সেখান থেকে নূন্যতম ২০ হাজার টাকার কমে কোন ডেলিভারি হয় না। তাদের পর্যাপ্ত ইকুইপমেন্ট’র সংকট আছে। তাই ডেলিভারিতে সময় ক্ষেপণ হয়। অফডকগুলোর জটিলতার কারণে সিএন্ডএফ’র কোন কর্মচারীও সেখানে কাজ করতে চায় না। তারা প্রতিনিয়ত কাজের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »

Translate »